বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০১ পূর্বাহ্ন

নোটিশঃ
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সাংবাদিক  নিয়োগসহ পরিচয় পত্র নবায়ণ চলছে।

হাজীগঞ্জে মাদক খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ !

নুর মোহাম্মদ পাটোয়ারী :

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে গত এক মাসে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে মাত্র ৭৭ পিস ইয়াবা ও ১৪০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় ১৬টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২০ জনকে। তবে স্থানীয়দের দাবি, মাদকের ব্যবহার কমার পরিবর্তে বিভিন্ন এলাকায় মাদকসেবীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ কমে যাওয়ায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

একসময় মাদকবিরোধী অভিযানে চাঁদপুর জেলার আলোচিত থানাগুলোর মধ্যে ছিল হাজীগঞ্জ থানা। নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করে প্রশংসা ও স্বীকৃতিও পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মাদক উদ্ধারে জেলার ‘শ্রেষ্ঠ’ হওয়ার ধারাবাহিকতাও ছিল পুলিশের।

তবে সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যানে সেই চিত্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ ৩০ দিনের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে হাজীগঞ্জ থানা পুলিশের অভিযানে ৭৭ পিস ইয়াবা ও ১৪০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় ১৬টি মামলা দায়ের এবং ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা থাকলেও উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়মিত মাদক সেবনের খবরও পাওয়া যায়। কিন্তু এসব অভিযোগের তুলনায় পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ খুবই কম বলে মনে করছেন তারা।

মাদক কমেছে, নাকি অভিযানে ভাটা?

হাজীগঞ্জ থানা পুলিশের অতীতের মাদকবিরোধী অভিযানের সঙ্গে বর্তমান পরিসংখ্যানের তুলনাই মূলত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একসময় বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি বড় ও খুচরা পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের কারণে হাজীগঞ্জ থানা পুলিশের কার্যক্রম প্রশংসিত হয়েছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এক মাসে মাত্র ৭৭ পিস ইয়াবা ও ১৪০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের তথ্য সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে—মাদকের সরবরাহ কি সত্যিই কমেছে, নাকি পুলিশের অভিযানে উদ্ধার কমেছে?

এ ছাড়া মাদক সরবরাহের ধরন ও কৌশলে পরিবর্তন এসেছে কি না, বড় কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নও উঠছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বক্তব্যেও ভিন্ন চিত্র

হাজীগঞ্জের মাদক পরিস্থিতি সম্পর্কে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ উপজেলায় মাদকের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। মাদকের বিস্তার রোধে অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে কাজ করছে এবং বিভিন্ন সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

সূত্রটি আরও জানায়, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদকের সরবরাহ বন্ধে বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পুলিশের গত ৩০ দিনের উদ্ধার তথ্য মিলিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। মাদকের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি হলে পুলিশের অভিযানে এক মাসে মাত্র ৭৭ পিস ইয়াবা ও ১৪০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের কারণ কী—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চান স্থানীয়রা

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, হাজীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির বিষয়ে অনেকেই অবগত থাকলেও বড় কারবারি কিংবা সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা তুলনামূলক কম।

তাদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান শুধু খুচরা বিক্রেতা, বহনকারী কিংবা সেবনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে মাদকের মূল সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ করা কঠিন। মাদকের উৎস, সরবরাহের পথ, বড় কারবারি এবং তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ বলছেন, অতীতের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ যদি সত্যিই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে থাকে, তাহলে এর কারণ সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।

পুলিশের বক্তব্য

এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে হাজীগঞ্জ-ফরিদগঞ্জ সার্কেলের পুলিশ সুপার মুকুল কুমার চাকমা বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান করছি। মাদকবিরোধী সভা করছি। মাদক এখন আর সহজলভ্য না।”

অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. লুৎফর রহমান বলেন, “আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।”

পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর—দুই পক্ষই মাদক নির্মূলে নিয়মিত কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছে। তবে পুলিশের দেওয়া গত ৩০ দিনের পরিসংখ্যানে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, মাদকসেবীর সংখ্যা যদি কমে না থাকে, তাহলে তাদের কাছে মাদক আসছে কোথা থেকে? মাদকের সরবরাহব্যবস্থা কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলছে, নাকি মাদক ব্যবসার কৌশলে পরিবর্তন এসেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন হাজীগঞ্জের সচেতন মহল।

নিউজটি শেয়ার করুন

All rights reserved © meghnapost.com